জগদ্ধাত্রী পূজায় নৃত্যশিল্পী রিংকি সাহার আঙিনা মাতোয়ারা, বাংলাজুড়ে ঐতিহ্যের উৎসব

কলকাতা, অক্টোবর ২০২৫: কালীপুজো শেষ হতেই আবারও বাংলার আকাশে ভেসে উঠেছে জগদ্ধাত্রী পূজার ঘণ্টাধ্বনি। দুর্গার এক রূপ জগদ্ধাত্রী — যিনি জ্ঞানের আলো ও আত্মসংযমের প্রতীক। চন্দননগর থেকে কলকাতা, নবদ্বীপ থেকে কৃষ্ণনগর — সর্বত্রই এখন দেবী আরাধনায় মুখরিত বাংলা।

রিংকি সাহার গৃহে ভক্তি, নৃত্য ও আনন্দের আবহ

বাংলার সাংস্কৃতিক জগতে সুপরিচিত নৃত্যশিল্পী রিংকি সাহা-র বাড়িতেও এবছর জগদ্ধাত্রী পূজার বিশেষ আয়োজন হয়েছে। কয়েক বছর ধরে তাঁর একমাত্র পুত্র ঋত্বিক সাহার উদ্যোগে তাঁদের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই পূজা, যা এখন হয়ে উঠেছে প্রতিবেশী ও অনুরাগীদের মিলনক্ষেত্র।

আজ সকাল থেকেই পূজামণ্ডপে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়। মা মহামায়ার জগদ্ধাত্রী রূপে লাল পেরা গরদ শাড়িতে প্রতিমার মনোমুগ্ধকর সাজ নজর কাড়ছে সকলের। ঢাকের তালে তালে, মন্ত্রোচ্চারণে ও শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত পরিবেশ।
রিংকি সাহা ও তাঁর স্বামী দীপঙ্কর সাহা নিজে উপস্থিত থেকে অতিথিদের সঙ্গে কথা বলেন, পূজার আয়োজনের অভিজ্ঞতা ভাগ করেন। পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও অনুরাগীদের উপস্থিতিতে গৃহ প্রাঙ্গণ যেন উৎসবের রঙে ভরে উঠেছে।

ঐতিহ্যের শিকড়: নবদ্বীপ থেকে চন্দননগরের আলোয়

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন প্রথম নবদ্বীপে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিষ্য সার্বভৌম ভট্টাচার্যর হাত ধরে। পরে ফরাসি শাসিত চন্দননগরের জমিদার পরিবারগুলি এই পূজাকে ঐতিহ্যে পরিণত করে।
দেবী জগদ্ধাত্রীকে দুর্গার চতুর্থ রূপ বলা হয় — চার হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ; বাহন সিংহ, পায়ের নীচে হাতি-আকৃত অহঙ্কার। তাঁর প্রতিমা প্রকাশ করে জ্ঞানের বিজয় ও অহঙ্কারের পরাজয়।

চন্দননগরে আলোর জগৎ, বাংলার গর্ব

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজা এখন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত আলো উৎসব হিসেবে। দুর্গাপুজোর মতোই এখানে মণ্ডপ, প্রতিমা ও আলোকসজ্জার প্রতিযোগিতা চলে। প্রতিটি অলিগলি আলোয় সেজে ওঠে।
স্থানীয় কারিগরদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি বৈচিত্র্যময় আলোচিত্র — যা এখন বাংলার গর্ব। দূরদূরান্ত থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা ভিড় জমান এই আলোকমেলার সাক্ষী হতে।

কলকাতার বনেদি বাড়িতে  পূজো: ঐতিহ্য এখনো অটুট

উত্তর কলকাতার শোভাবাজার, বাগবাজার, বরানগর থেকে বেহালা, সল্টলেক  — বহু বনেদি বাড়িতে আজও জগদ্ধাত্রী পুজো পালিত হয় পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষা করে।
কালীপুজোর পরদিন থেকেই শুরু হয় প্রতিমা গড়ার কাজ। সাদা শাড়ি, লাল পাড়, হাতে অস্ত্র, মুখে শান্ত জ্যোতি — ঐতিহ্যের প্রতিমূর্তি মা জগদ্ধাত্রী।

সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত চলে চণ্ডীপাঠ, ঢাকের বাদ্য, ধুনুচি নাচ, প্রসাদ বিতরণ ও পারিবারিক মিলন। পুরনো বাড়িগুলির এই পুজাতে বাইরের চাকচিক্যের চেয়ে বড় হল ভক্তি আর পারিবারিক বন্ধন।

নতুন প্রজন্মের উৎসাহে ক্লাব পুজোও জনপ্রিয়

কলকাতা ও আশেপাশের এলাকায় এখন বহু ক্লাবও জগদ্ধাত্রী পূজার আয়োজন করছে। তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণে তৈরি হচ্ছে নতুন ঐতিহ্য।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোকসজ্জা, ও সমাজসেবামূলক উদ্যোগে এই ক্লাব পূজো এখন হয়ে উঠছে সামাজিক সংহতির প্রতীক।

 

জগদ্ধাত্রী পূজা: ভক্তি, সংস্কৃতি ও আত্মগরিমার সংমিশ্রণ

জগদ্ধাত্রী পূজা আজ শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলার আত্মগরিমা, নারীশক্তি ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক
‘জগদ্ধাত্রী’ অর্থাৎ যিনি জগৎ ধারণ করেন — সেই শক্তির আরাধনায় ভাসছে গোটা বাংলা।
চন্দননগরের আলো থেকে কলকাতার বনেদি বাড়ি — সর্বত্রই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এক সুর, ভক্তি, ঐতিহ্য ও আলোর মিলনে জগদ্ধাত্রী মায়ের বন্দনা।”

Leave a Comment