Prasongik Bangla

Prasongik Bangla News

লোকগানের ইতিহাস ও পরম্পরা পেরিয়ে ‘সাঁকো’: জ্ঞানমঞ্চে দ্য আউটল্যান্ডার্সের প্রথম একক অনুষ্ঠান

বাংলার মাটি ও মানুষের জীবনের সুরে বেঁচে থাকা প্রাচীন ঐতিহ্য বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া থেকে ঝুমুর ও গম্ভীরা— লোকসঙ্গীতের প্রতিটি ধারায় ধরা পড়েছে মানুষের জীবন, শ্রম, প্রেম, বিশ্বাস ও সামাজিক অভিজ্ঞতার গল্প

কলকাতা,প্রাসঙ্গিক AG: বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে লোকসঙ্গীতের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। গ্রামবাংলার মাঠ, নদী, ঘাট, উঠোন কিংবা উৎসবের আসর—জীবনের প্রায় প্রতিটি পরিসরেই একসময় মানুষের সঙ্গী ছিল লোকগান। লিখিত সাহিত্যের জনপ্রিয়তার বহু আগে থেকেই সাধারণ মানুষ মুখে মুখে গান, ছড়া ও সুরের মাধ্যমে নিজেদের আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, বিরহ, শ্রম এবং বিশ্বাসের কথা প্রকাশ করেছেন। সেই ধারাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আজকের লোকসঙ্গীতের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

বাংলা ভাষা ও পূর্বভারতের প্রাচীন গীতিকবিতার ইতিহাসে চর্যাপদ একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। পরবর্তী সময়ে বৈষ্ণব পদাবলি, শাক্ত পদ এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক গানের ধারার বিকাশ বাংলার সংগীত ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।

বাংলার লোকগানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর বিপুল বৈচিত্র্য। ভৌগোলিক অঞ্চল, মানুষের পেশা, সামাজিক পরিবেশ এবং ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের লোকগানের ধারা। বাউল গান মানবতাবাদ, আত্মঅন্বেষণ ও আধ্যাত্মিক ভাবনার জন্য পরিচিত।ভাটিয়ালি গান মূলত নদী ও মাঝির জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।ভাওয়াইয়া উত্তরবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় লোকগানের ধারা।কীর্তন বৈষ্ণব ভাবধারা ও কৃষ্ণভক্তির সঙ্গে যুক্ত।গম্ভীরা বিশেষ করে মালদহ ও উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ।ঝুমুর পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এছাড়াও কবিগান, সারি ও জারি গান বাংলার লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কবিগানে কবিয়ালদের প্রশ্নোত্তর ও তর্কের মধ্য দিয়ে গান পরিবেশিত হয়। অন্যদিকে সারি গান শ্রম ও নৌযাত্রার সঙ্গে এবং জারি গান ধর্মীয় ও সামাজিক আবেগের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন লোকধারাকে তুলে ধরে।

লোকসঙ্গীতের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এর মৌখিক পরম্পরা। বহু লোকগানের রচয়িতার নাম আজও অজানা। গানগুলি এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে মানুষের স্মৃতি, কণ্ঠ এবং পরিবেশনার মাধ্যমে।

এই কারণেই লোকগানকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক সম্পর্ক, পেশা, বিশ্বাস, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক এবং আবেগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার ক্ষেত্রেও লোকগান গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দলিল।

উনিশ ও বিশ শতকে বাংলার লোকসংস্কৃতি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গবেষক, সংগ্রাহক ও শিল্পীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। লোকসুর ও লোকধারার প্রভাব বাংলা আধুনিক গান ও সাহিত্যেও দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং কাজী নজরুল ইসলামের মতো স্রষ্টাদের সৃষ্টিতেও বিভিন্ন লোকজ সুর ও সাংস্কৃতিক উপাদানের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

রেডিও, গ্রামোফোন, সিনেমা ও টেলিভিশনের হাত ধরে লোকসঙ্গীত গ্রামবাংলার সীমা পেরিয়ে বৃহত্তর শ্রোতার কাছে পৌঁছয়। বর্তমানে ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম লোকগানের নতুন শ্রোতা তৈরি করছে। একই সঙ্গে পুরনো গান সংগ্রহ, আর্কাইভ তৈরি এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের পরিবেশনার মাধ্যমে এই ঐতিহ্য নতুন পরিসরও পাচ্ছে।

গ্রামবাংলার উঠোন থেকে ডিজিটাল মঞ্চ

সময়ের সঙ্গে লোকসঙ্গীতের পরিবেশনা ও প্রচারের মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু এর মূল বিষয় এখনও মানুষের জীবন। কৃষকের মাঠ, মাঝির নৌকা, গ্রামের উৎসব, প্রেম-বিরহ, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক বাস্তবতা কিংবা আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান—সবকিছুরই প্রতিফলন রয়েছে লোকগানের সুরে।

বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে লোকসঙ্গীতের এই সম্পর্কই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। সময় বদলেছে, বদলেছে গান পরিবেশনের মাধ্যম; কিন্তু মানুষের অনুভূতি ও জীবনকথাকে সুরে ধরে রাখার সেই প্রাচীন ঐতিহ্য এখনও অটুট।

লোকগানের পরম্পরা পেড়িয়ে  পারাপারের “সাঁকো”

লোকসঙ্গীত শুধু অতীতের উত্তরাধিকার নয়, তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে সময় ও ভূগোল পেরিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগসূত্র। সেই যোগসূত্রেরই এক সুরেলা সন্ধান মিলল গত ২০ সেপ্টেম্বর জ্ঞানমঞ্চে দ্য আউটল্যান্ডার্সের প্রথম একক অনুষ্ঠান ‘লোকগানের পরম্পরা ও পারাপারের সাঁকো’-তে।

দুটি পর্বে সাজানো এই অনুষ্ঠানের প্রথম ভাগ ‘পরম্পরা’। বাংলা লোকগানের নিজস্ব সুর, মেজাজ ও ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক সঙ্গীতায়োজনের মাধ্যমে তাকে সমকালীন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা ছিল এই পর্বের মূল ভাবনা। লালনের গান থেকে সুনীল মাহাতোর ঝুমুর, উত্তরবঙ্গের লোকগান থেকে সলিল চৌধুরীর কালজয়ী ‘হেই সামালো হেই সামালো’—বিভিন্ন ধারার গান একসূত্রে গেঁথে নেয় দলটি। এর সঙ্গে ছিল দ্য আউটল্যান্ডার্সের নিজস্ব পুজোর গান ‘আনন্দের আনন্দময়ী’।

এরপরই শুরু হয় ‘পারাপার’। বাংলা লোকগানের সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের লোকসঙ্গীতের সুর, ভাব ও বক্তব্যের অন্তর্লীন মিলকে খুঁজে নেওয়াই ছিল এই পর্বের মূল আকর্ষণ। পাঞ্জাবের লোকগানের সঙ্গে হাসন রাজার গানের মেলবন্ধন, বাংলা কীর্তনের সঙ্গে গুজরাতের রাসের গান এবং অসমের হোলির গানের সংযোগ, আওয়াধি লোকগানের সাথে উত্তরবঙ্গের গানের মেলবন্ধন আর একই সাথে লাল মেরি,ছাপ তিলক ও শাহ আব্দুল করিমের বন্দে মায়া লাগাইছে এই প্রতিটি পরিবেশনাতেই ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধনের চেষ্টা ধরা পড়েছে। দূরবীন শাহ এর মারফতি গান “নমাজ আমার” ও মীরা বাই এর ভজন “সাধন করনা চাহি” যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

অনুষ্ঠানের আরও একটি উল্লেখযোগ্য পরিবেশনা ছিল রাগ ভৈরবীর উপর নির্মিত কম্পোজিশন, যেখানে শাস্ত্রীয় বন্দিশের সঙ্গে বাউলগানের মেলবন্ধন ঘটানো হয়। আর একেবারে অন্য ভূগোলের দরজা খুলে দেয় ‘ঘরে ফেরার গান’। জন ডেনভারের ‘Take Me Home, Country Roads’-এর সঙ্গে ‘হস্তির নড়ান হস্তির চরান’-এর সংযোগে তৈরি হয় এক অভিনব সঙ্গীত-অনুষঙ্গ। যেন দেশ-কাল-ভাষার সীমা অতিক্রম করে একই অনুভূতির কাছে ফিরে আসার গল্প।

এই ভিন্নধারার সঙ্গীত-ভাবনা দর্শকদের মধ্যে যথেষ্ট সাড়া ফেলে। একের পর এক পরিবেশনের শেষে করতালি, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় ভরে ওঠে জ্ঞানমঞ্চ। বিশেষ করে লোকগানকে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন না করে নতুন সঙ্গীতায়োজনের মাধ্যমে বর্তমানের শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা নজর কাড়ে।

সেদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কলকাতার সঙ্গীত ও সংস্কৃতি জগতের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। ছিলেন ভূমি ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়, সঙ্গীতশিল্পী অলোক রায়চৌধুরী, ড. তপন রায়, ড. রীতা সাহা, শ্রী প্রদ্যুৎ মুখার্জী, ICCR-এর প্রাক্তন ডিরেক্টর গৌতম দে, MusiConnect India-র কর্ণধার কৌশিক দত্ত-সহ আরও অনেকে। উপস্থিত ছিলেন এ প্রজন্মের বহু শিল্পী সহ কলকাতার সঙ্গীতমহলের বহু পরিচিত মুখ। শিল্পীদের গান শোনা, শুভেচ্ছা জানানো এবং আন্তরিক ভালোবাসায় দ্য আউটল্যান্ডার্সের পাশে দাঁড়ানো অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

দ্য আউটল্যান্ডার্সের ‘সাঁকো’ তাই শুধুমাত্র একটি কনসার্ট নয়—এ যেন লোকসঙ্গীতের শিকড় থেকে সমকালীনতার দিকে, বাংলা থেকে ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে, আবার সেখান থেকে বিশ্বের অন্য সঙ্গীতভাষার দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক সৃজনশীল যাত্রা। পরম্পরাকে সঙ্গে নিয়ে পারাপারের যে সাঁকো তারা তৈরি করতে চেয়েছিল, সেই সন্ধ্যায় জ্ঞানমঞ্চে তারই এক সুন্দর সুররূপ ধরা পড়ল।

“সময় বদলেছে, সুর বদলেছে—কিন্তু বাংলার মাটির সঙ্গে মিশে থাকা লোকগানের আত্মা আজও অমলিন।”

– প্রাসঙ্গিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *