আইএফএ শিল্ড – ভারতীয় ফুটবলের গৌরব, ঐতিহ্য আর অবিনশ্বর উত্তরাধিকার

কলকাতা, অক্টোবর ২০২৫ — মাঠের আলো জ্বলে উঠতেই যখন কলকাতার ময়দানে গ্যালারি কাঁপে “বাগান”, “বেঙ্গল” ধ্বনিতে, তখনও সেই পুরোনো জাদু যেন ফিরে আসে। ১৩০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজও আইএফএ শিল্ড শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়—এটি এক জীবন্ত ইতিহাস, এক অমূল্য ঐতিহ্য।

১৮৯৩ সালে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টটি ভারতের প্রাচীনতম ফুটবল প্রতিযোগিতা এবং বিশ্বের অন্যতম পুরনো। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (IFA) এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছিল মূলত ব্রিটিশ রেজিমেন্ট ও ইউরোপীয় দলগুলির অংশগ্রহণে। প্রথম আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল রয়্যাল আইরিশ রাইফেলস, এবং দীর্ঘ বছর ধরে ব্রিটিশ সেনা দলগুলিই দাপট দেখিয়ে গিয়েছে।

তবে ইতিহাস পাল্টে যায় ১৯১১ সালে। সেই বছর, খালি পায়ে খেলা ভারতীয় ফুটবলারদের দল মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব ব্রিটিশ সেনাদল ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট-কে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। এই জয় শুধু ফুটবল মাঠে নয়, ভারতের জাতীয় গর্ব ও স্বাধীনতার আন্দোলনের এক প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ‘অমর একাদশ’ নামে পরিচিত সেই দল প্রমাণ করেছিল—দেশজ মাটির ছেলেরা ইস্পাতের বুট পরা ব্রিটিশদেরও হারাতে পারে।

স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলিতে আইএফএ শিল্ড হয়ে উঠেছিল ভারতীয় ফুটবলের প্রাণ। কলকাতার দুই মহাতারকা ক্লাব — ইস্ট বেঙ্গলমোহনবাগান — এই টুর্নামেন্টের আসল নায়ক। তাদের ঐতিহ্যবাহী কলকাতা ডার্বি-ই হয়ে উঠেছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

ইস্ট বেঙ্গল ১৯৪৩ সালে প্রথমবার শিল্ড জিতে শুরু করে এক দুর্দান্ত যুগের। এরপর একের পর এক শিরোপা জিতে তারা আজও রেকর্ড ২৯ বার আইএফএ শিল্ড জয় করেছে। বিশেষভাবে স্মরণীয় ১৯৭৩ সালের জয়, যখন তারা উত্তর কোরিয়ার পিয়ংইয়ং সিটি ক্লাব-কে হারিয়ে এশীয় ফুটবলে ভারতীয় গর্বের পতাকা উড়িয়েছিল।

অন্যদিকে, মোহনবাগান ফুটবল মানেই ইতিহাস, আবেগ আর গৌরব। স্বাধীনতার আগে ও পরের দশকজুড়ে বাগানের শিল্ড জয় ভারতীয় ফুটবলের সমার্থক হয়ে উঠেছিল। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে একটানা চারবারের শিল্ড জয়ের রেকর্ড আজও কিংবদন্তি। আর ২০২৫ সালের ১২৫তম সংস্করণে আবারও ট্রফি উঠেছে সবুজ-মেরুনের হাতে — যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।

এই শতাব্দীতে কলকাতার বাইরেও শিল্ডের গৌরব ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। রিয়েল কাশ্মীর এফসি-র পরপর দু’বছর (২০২০ ও ২০২১) শিল্ড জয় যেন নতুন যুগের সূচনা করেছে। বরফে ঢাকা উপত্যকা থেকে ময়দানের মাটি পর্যন্ত, ফুটবলের এই যাত্রা আজ সর্বভারতীয়।

২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত আইএফএ শিল্ড যুব প্রতিযোগিতা হিসেবে আয়োজন করা হয়, তরুণ প্রতিভাদের সুযোগ দিতে। কিন্তু ২০২০ থেকে এটি আবার পূর্ণাঙ্গ সিনিয়র টুর্নামেন্ট হিসেবে ফিরে আসে। পরিবর্তনের মাঝেও ঐতিহ্যের মূল সুর একই থাকে — ফুটবলপ্রেম, গর্ব, ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতা।

খালি পায়ে খেলা দেশীয় বীর থেকে আজকের আন্তর্জাতিক তারকা— আইএফএ শিল্ড দেখেছে ভারতীয় ফুটবলের প্রতিটি রূপান্তর। এই ট্রফি শুধু রূপোর নয়, এটি প্রতিটি প্রজন্মের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।

আজ যখন ভারতীয় ফুটবল নতুন লিগ, নতুন বিনিয়োগ ও গ্লোবাল স্বপ্নের পথে হাঁটছে, তখনও আইএফএ শিল্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয় — এখানেই শুরু হয়েছিল সবকিছু। শিল্ড মানেই ঐতিহ্য, আবেগ, গৌরব আর ইতিহাসের গাঁথা। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও এর আলো অম্লান, এর জ্যোতি আজও অক্ষয়।

 

 

Leave a Comment