নবি মুম্বই, ৩ নভেম্বর ২০২৫: ভারতের নারী ক্রিকেট দল ইতিহাস গড়ল। প্রথমবারের মতো আইসিসি মহিলা বিশ্বকাপ ২০২৫ জিতে নিল ভারত। ম্যাচ শেষে যখন গোটা নবি মুম্বই স্টেডিয়াম জুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল — “We are the Champions!”, তখন দলের আবেগ ছাপিয়ে গিয়েছিল সীমারেখা। চোখের জলে ভিজে উঠলেন ভারতীয় কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামী, যিনি অবশেষে হাতে তুললেন সেই ট্রফি, যার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন এক যুগ ধরে। পাশে ছিলেন আরেক কিংবদন্তি মিতালি রাজ — দু’জনেই গর্বে ও আনন্দে আপ্লুত।
ঝুলন-মিতালির স্বপ্নপূরণ, ভারতের ইতিহাস রচনা
২০১৭ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে অল্পের জন্য ট্রফি হাতছাড়া হয়েছিল ভারতের। কিন্তু এ বার আর কোনো ভুল নয়। ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৫২ রানে হারিয়ে ভারত ছিনিয়ে নিল ইতিহাসের প্রথম মহিলা বিশ্বকাপ ট্রফি। গোটা দেশজুড়ে এই জয় উদযাপিত হচ্ছে মহিলা ক্রিকেটের নবযুগ হিসেবে।
দীপতি শর্মা ও শেফালি ভার্মার দুরন্ত পারফরম্যান্স
ভারতের জয়ের নায়ক দুজন — দীপতি শর্মা ও শেফালি ভার্মা। টস জিতে ব্যাটিং নেন ভারত। বৃষ্টির কারণে ম্যাচ কিছুক্ষণ বিলম্বিত হলেও শেফালি শুরু থেকেই আগ্রাসী মেজাজে। মাত্র ৭৮ বলে ৮৭ রানের ঝড়ো ইনিংস, সঙ্গে স্মৃতি মন্ধানা’র ৪৫। দুই ওপেনারের জুটিতে ভারতের রান পৌঁছে যায় ১০০ ছাড়িয়ে।
এরপর কিছুটা ধাক্কা এলেও মাঝের ওভারে দীপতি শর্মা দারুণ ইনিংস খেলে দলকে ধরে রাখেন। তাঁর ৫৮ রানের ইনিংস এবং রিচা ঘোষের ২৪ বলে ৩৪ রানের ঝোড়ো ব্যাটিং ভারতের স্কোর নিয়ে যায় ২৯৮/৭-এ। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের মধ্যে আয়াবোঙ্গা খাকা ছিলেন সবচেয়ে সফল (৩/৫৮)।
বোলিংয়েও দীপ্তি-শেফালির জাদু
২৯৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দক্ষিণ আফ্রিকার শুরুটা ভালোই হয়েছিল। অধিনায়ক লরা উলভার্ড্ট দুর্দান্ত ব্যাটিং করে ১০১ রান তোলেন এবং টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন (৫১০ রান)। কিন্তু ভারতের স্পিনাররা ছন্দে এলেই ম্যাচ ঘুরে যায়।
দীপতি শর্মা তাঁর অলরাউন্ড নৈপুণ্যে পাঁচ উইকেট তুলে নেন (৫/৩৯) এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দেন। শেফালি ভার্মাও বল হাতে জ্বলে ওঠেন, তুলে নেন ২ উইকেট। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা অলআউট হয়ে যায় ২৪৬ রানে (৪৫.৩ ওভারে) — ভারত জেতে ৫২ রানে এবং ইতিহাসের পাতায় সোনালি অধ্যায় রচনা করে।
চোখের জলে ভিজে ওঠে আনন্দের মুহূর্ত
ফাইনালের শেষে ট্রফি হাতে নিয়ে মাঠে নামেন ভারতীয় দল। তখন স্ট্যান্ডে ছিলেন তিন কিংবদন্তি — ঝুলন গোস্বামী, মিতালি রাজ ও অঞ্জুম চোপড়া। বিজয়ী দল তাদের সম্মান জানিয়ে মাঠে ডেকে নিয়ে আসে। ট্রফি হাতে নিয়ে আবেগে কেঁদে ফেলেন ঝুলন। এক দশকের পরিশ্রম, সংগ্রাম আর স্বপ্নের বাস্তবায়ন — এক মুহূর্তে মিলেমিশে গেল চোখের জলে।
অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর বলেন, “এই জয় শুধু আমাদের নয়, প্রতিটি ভারতীয় নারীর। আমরা দাঁড়িয়ে আছি ঝুলন দিদি আর মিতালি দির কাঁধে।”
বিসিসিআই ঘোষণা করল ৫১ কোটি টাকার পুরস্কার
ভারতের ঐতিহাসিক জয়ের পর বিসিসিআই ঘোষণা করেছে বিশাল পুরস্কার — ৫১ কোটি টাকা। বিসিসিআই সচিব জয় শাহ জানান, “আইসিসি-র প্রাইজ মানির বাইরে, বিসিসিআই নিজস্ব তহবিল থেকে এই পুরস্কার দিচ্ছে।”
আইসিসি-র তরফে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল, বিশ্বকাপজয়ী দল পাবে ৪.৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ₹৪২ কোটি) — যা মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পুরস্কার।
রেকর্ড ভাঙা পারফরম্যান্স
রিচা ঘোষ এক টুর্নামেন্টে সর্বাধিক ছক্কার রেকর্ডে (১২) সারিবদ্ধ হলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ডিএন্দ্রা ডটিন ও দক্ষিণ আফ্রিকার লিজেল লি-র সঙ্গে। দীপ্তি শর্মা টুর্নামেন্টে সর্বাধিক উইকেট (১৮) নিয়ে শেষ করলেন, আর শেফালি ভার্মা প্রমাণ করলেন, ভারতীয় নারী ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ তাঁর হাতে নিরাপদ।
মহিলা ক্রিকেটের নবযুগের সূচনা
আতশবাজির আলোয় আলোকিত নবি মুম্বই স্টেডিয়ামে যখন গোটা দল ট্রফি উঁচিয়ে ধরল, তখন গোটা দেশ একসাথে গাইল — “ইন্ডিয়া! ইন্ডিয়া!”।
এ শুধু একটি খেলার জয় নয়, এটি এক বিশ্বাস, অধ্যবসায় ও নারী শক্তির জয়গান।
ফাইনালের স্কোর:
ভারত: ২৯৮/৭ (৫০ ওভার) — শেফালি ভার্মা ৮৭, দীপ্তি শর্মা ৫৮; আয়াবোঙ্গা খাকা ৩/৫৮
দক্ষিণ আফ্রিকা: ২৪৬ অলআউট (৪৫.৩ ওভার) — লরা উলভার্ড্ট ১০১; দীপ্তি শর্মা ৫/৩৯, শেফালি ভার্মা ২/৩৬
ফলাফল: ভারত জিতল ৫২ রানে
ছবি সৌজন্যে: সোশ্যাল মিডিয়া

