প্রাসঙ্গিক প্রতিবেদন:
বিশ্বজুড়ে অশান্তির আবহে শিল্পের মাধ্যমে শান্তি ও মানবতার বার্তা পৌঁছে দিতে কলকাতায় আয়োজিত হল এক ব্যতিক্রমী শিল্প প্রদর্শনী— “Devi on Canvas”। বেঙ্গল ক্রিয়েটিভ ক্লাবের উদ্যোগে ICCR Nandalal Bose Art Gallery, Kolkata অনুষ্ঠিত এই তিনদিনের (২৭, ২৮ ও ২৯ মার্চ) প্রদর্শনী ইতিমধ্যেই শিল্পপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ২৭ মার্চ বিকেল ৫টায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়।
এই প্রদর্শনীতে মোট ৭৬ জন শিল্পী অংশগ্রহণ করেন। চিত্রকলা, ভাস্কর্য এবং ফটোগ্রাফির মাধ্যমে শিল্পীরা দেবী শক্তি, মানবতা এবং আধ্যাত্মিকতার গভীর প্রকাশ ঘটান। প্রতিটি শিল্পকর্মে ফুটে ওঠে শিল্পীদের নিজস্ব অনুভূতি, দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যাখ্যা।
বেঙ্গল ক্রিয়েটিভ ক্লাবের প্রেসিডেন্ট সুরথ চক্রবর্তী এবং ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর শর্মিষ্ঠা রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে এই প্রদর্শনীর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা হয়। তাঁদের উদ্যোগে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে একক মডেল শর্মিষ্ঠা রায় চৌধুরীকে কেন্দ্র করে শতাধিক নান্দনিক নিউড আর্ট নিয়ে একটি অভিনব আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। সেই ধারাবাহিকতায় এবছরের ‘Devi on Canvas’ প্রদর্শনী সেই সৃজনশীল যাত্রারই পরবর্তী অধ্যায়।
প্রদর্শনীর একটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল কুমোরটুলির ঐতিহ্যবাহী শিল্পীদের সংবর্ধনা, যাঁদের হাত ধরে বিশ্বজুড়ে দেবী আরাধনার ঐতিহ্য বহমান রয়েছে।
এছাড়াও প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে উদ্বোধন করে সর্বধর্ম সমন্বয় ও সামাজিক ঐক্যের এক শক্তিশালী বার্তা দেওয়া হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন—
বিশপ ডঃ শ্রীকান্ত দাস, প্রতিষ্ঠাতা, গুড নিউজ মিশন অফ ইন্ডিয়া এবং আহ্বায়ক, খ্রিস্টান সংখ্যালঘু সেল
পিয়াল অধিকারী, সচিব, মহেশ জগন্নাথ মন্দির এবং প্রতিষ্ঠাতা, মহেশ জগন্নাথ উন্নয়ন ট্রাস্ট
ভিক্ষু বিশ্বজিৎ, বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং সহকারী সম্পাদক, বদোধা ধর্মাঙ্কুর সভা, ভারত
মহম্মদ এহতেশামুল হক সিদ্দিকি (সংখ্যালঘু সেল, তৃণমূল সংগঠন),
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ঋতব্রত ভট্টাচার্য, ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় এর প্রপৌত্র এবং “মিশন বিদ্যাসাগর”-এর সভাপতি অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়। টলিউডের বিশিষ্ট পরিচালক ও অভিনেতা অনিন্দ্য সরকার, তবলা বাদক মল্লার ঘোষ সহ চলচ্চিত্র জগতের অন্যান্য ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ এবং সমাজের বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন, যা অনুষ্ঠানের মর্যাদা আরও বাড়িয়ে তোলে। কুমোরটুলির দুজন বিশিষ্ট মৃৎশিল্পীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়- শ্রী জগদীশ দত্ত এবং শ্রী বঙ্কিম পাল , যেহেতু এই কুমোরটুলি মৃৎশিল্পীর মাধ্যমে সারা বিশ্বে দেবী বন্দনা হয়, তাই বেঙ্গল ক্লিটির ক্লাব থেকে এনাদের সম্মান প্রদান করা হয়।
প্রদর্শনীতে দর্শকদের বিপুল ভিড় লক্ষ্য করা যায়, যা নিয়ন্ত্রণ করাও একসময় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। শিল্প প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে এমন বিপুল জনসমাগম বিরল—যা এই উদ্যোগের জনপ্রিয়তারই প্রমাণ।
প্রবীণ শিল্পীদের পাশাপাশি নবীন শিল্পীদের কাজও দর্শকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। তাঁদের নতুন ভাবনা ও সৃজনশীলতা দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে।
এই প্রসঙ্গে সুরথ চক্রবর্তী বলেন,
“২০০৫ সাল থেকে আমরা নতুন চিন্তাধারার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছি। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমাদের এই শান্তির বার্তা সমাজে প্রভাব ফেলবে বলেই আমরা আশাবাদী।”
অন্যদিকে শর্মিষ্ঠা রায় চৌধুরী জানান,
“ভারতে বাস্তবধর্মী শিল্প যখন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, তখন বেঙ্গল ক্রিয়েটিভ ক্লাব সেই ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজ করছে। এবছরের ‘দেবী শক্তি’ থিম ইতিবাচক শক্তির উদ্ভব ঘটানোর এক প্রচেষ্টা।”
আয়োজকদের মতে, এই প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য শান্তি, সহমর্মিতা এবং মানবতার প্রসার ঘটানো। শিল্পীদের কাজের মাধ্যমে বর্তমান অশান্ত বিশ্ব পরিস্থিতির প্রতিফলন যেমন উঠে এসেছে, তেমনই তুলে ধরা হয়েছে সম্প্রীতির পথ।
সব বয়সের দর্শকদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রদর্শনী প্রাঙ্গণ। দুর্গাপুজোর সমাপ্তির পর যেমন নতুন করে অপেক্ষা শুরু হয়, তেমনই ‘Devi on Canvas’-এর সমাপ্তির পর আবারও এমন একটি অভিজ্ঞতার প্রত্যাশায় রয়েছেন শিল্পী ও দর্শকরা।
