একটি মৃত্যু জন্ম দিল বহু প্রশ্নের

সিরিয়ালের শ্যুটিং করতে গিয়ে দিঘার কাছে তালসারিতে সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু হয়েছে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

তালসারিতে শ্যুটিংয়ে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকাল আকস্মিক মৃত্যুতে উঠছে প্রচুর প্রশ্ন। ময়নাতদন্তের রিপোর্টেও উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।  ঠিক কী ঘটেছিল অভিনেতার সঙ্গে, উত্তর খুঁজতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ইউনিটের লোকজন, স্থানীয় বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে। শ্যুটিং ইউনিটে কি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছিল না ?  এই প্রশ্ন বারবার উঠছে। ওড়িশা পুলিশ আগেই জানিয়েছে যে, সমুদ্রের জলে নেমে শ্যুটিংয়ের জন্য তাদের থেকে কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বলা হয়েছে প্রচুর পরিমাণে বালি ঢুকে রাহুলের ফুসফুস আকারে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। অনেকক্ষণ জলে ডুবে থাকলেই এমনটা সম্ভব বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

‘ফুটেজ একটা পেয়েছি, পরবর্তী পদক্ষেপ জানিয়ে দেব’, রাহুলের ঘটনা নিয়ে জানালেন পুলিশ সুপার –

তালসারিতে জলে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বেশি পরিমাণ বালি ও নোনাজল ঢুকে গেছিল ফুসফুস-খাদ্য ও শ্বাসনালিতে। এমনই উল্লেখ করা হয়েছে ময়নাতদন্তর প্রাথমিক রিপোর্টে। কিন্তু, গতকাল শ্যুটিং শেষ হওয়ার মুখে কীভাবে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল ? তা নিয়ে সমাজ-মাধ্যম-সহ বিভিন্ন পরিসরে চলছে কাটাছেঁড়া। ঘটনা নিয়ে কী বলেছে পুলিশ ?

পূর্ব মেদিনীপুরের এসপি অংশুমান সাহা বলেন, “একটা UD (আন-ন্যাচারাল ডেথ বা অস্বাভাবিক মৃত্য) কেস শুরু হয়েছে আমাদের দিঘা থানায়। ময়নাতদন্ত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব। ওড়িশা পুলিশের সঙ্গে কথা হয়েছে।  যারা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, তাঁদের বিবৃতি আমরা রেকর্ড করছি। বাকি যে সহযোগিতা লাগবে সেটা ওড়িশা পুলিশ করবে বলেছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে যা যা অফিসিয়াল ফর্ম্যালিটি করণীয় আমরা করব। ফুটেজ আমরা একটা পেয়েছি। পরবর্তী পদক্ষেপ জানিয়ে দেব। এই মুহূর্তে আমরা কোনও অভিযোগ এখনও পাইনি। শ্যুটিংয়ের যখন শেষ অবস্থা, সেই অবধি ফুটেজটা আমরা পেয়েছি। আমরা আরও তদন্ত করলে জানা যাবে। আরও তদন্ত এগোক। এই মুহূর্তে বলার মতো পজিশনে নেই।”

যে সময়ে তালসারির সমুদ্রসৈকতে ঘটে যায় দুর্ঘটনা, সেই সময়ে চলছিল শ্যুটিং! ধারাবাহিক ‘ভোলে বাবা পার করেগা’-র আউটডোর শ্যুটিং চলছিল। শ্যুটিংয়ের ফাঁকেই একটু বেশি জলের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন ধারাবাহিকের নায়ক রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়(Rahul Banerjee) ও শ্বেতা মিশ্র(Sweta Mishra)। সেই সময়ে হঠাৎ টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যান শ্বেতা, তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে জলে ডুবতে থাকেন রাহুলও ! পরিস্থিতি গুরুতর বুঝতে পেরে, তখন জলে ঝাঁপ দেন shooting এর লোকজনরা ! প্রথমে শ্বেতা, তারপরে রাহুলকে উদ্ধার করা হয়। শ্বেতা সামলে নিলেও, গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন রাহুল। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে চিকিৎসকেরা বলেন, ততক্ষণে সব শেষ। সাঁতার জানতেন না রাহুল বা শ্বেতা কেউই।

এই ঘটনা আবারও সামনে এনে দিল শুটিং সেটে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বড় প্রশ্ন।
একজন শিল্পীর জীবনের ঝুঁকি কি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে?

সম্ভাব্য কারণ

প্রাথমিক তদন্তে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ উঠে আসছে—

  • শুটিং সেটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব
  • লাইফগার্ড বা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দলের অনুপস্থিতি
  • ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যে অতিরিক্ত চাপ
  • জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিলম্ব

ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক সদস্যের কথায়,
“সবকিছু খুব দ্রুত ঘটেছে। কিন্তু উদ্ধারকাজ আরও দ্রুত হওয়া উচিত ছিল।”

‘মেরুদণ্ড সোজা রেখে কথা বলার লোক খুব বিরল হয়ে গেছে‘, খুবই বিরল ব্যক্তিত্ব ছিল, আমাদের মনে থাকবে’ ! রাহুলকে নিয়ে মন্তব্য তাঁর বন্ধু, সতীর্থ, সহকর্মী থেকে পাড়া-প্রতিবেশী সকলেরই ।

 

২৭ মার্চ থেকে শ্যুটিং চলছিল। ৩০-এ শ্যুটিং সেরে বাড়ি ফেরার পালা। কিন্তু সব শেষ, আর বাড়ি ফেরা হল না রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সোমবার দুপুরে ময়না তদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর, শববাহী গাড়ি রাহুলকে নিয়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেয়। রাহুলের গাড়িচালক ও ধারাবাহিকের সদস্যরা রাহুলের দেহ শেষ বারের মত নিয়ে আসেন তাঁর বিজয়গড়ের বাড়িতে। অভিনেতাকে দেখার জন্য মানুষের ঢল নামে তাঁর বাড়ির সামনে।তালসারিতে উদয়ের মধ্যগগনে অরুণোদয়-এর এ ভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেননা একেবারে। শোকস্তব্ধ গোটা টলিপাড়া।

শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় রাহুলের সম্পর্কে জানান, ”যারা যারা তাঁকে চিনতেন, প্রত্যেকের ক্ষতি। সাধারণত এত ভাল মানুষ ইন্ডাস্ট্রিতে, তারপর শিক্ষিত। খুবই বিরল ব্যক্তিত্ব ছিল, আমাদের মনে থাকবে।”

অভিনেত্রী উষসী চক্রবর্তী জানান, ”Rahul আমার কাছে কেবলমাত্র একজন অভিনেতা ছিলেন না। উনি আমার সহযোদ্ধা ছিলেন, মাঝে মাঝে কথা হতো। অভিনেতা হিসেবে উনাকে মূল্যায়ণ করার ধৃষ্টতা আমার নেই। কিন্তু আমরা এখন যে সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, তাতে স্পষ্ট কথা, সত্যি কথা মেরুদণ্ড সোজা করে কথা বলার লোক খুব বিরল হয়ে গেছে। বিভিন্ন ইস্যুতে কোনও দিকে না তাকিয়ে, নিজের স্বার্থের দিকে না তাকিয়ে, উনি যেভাবে স্ট্যান্ড নিতেন, সেটা আমাকে খুব অনুপ্রেরণা দিত। আমি জানিনা এমন অনুপ্রেরণা আর কথা থেকে পাবো।

অভিনেতা দেব বলেন, ”ওর সঙ্গে আমার, এটা বলব না যে, আমাদের খুব ভাল বন্ধুত্ব ছিল, কিন্তু একজন অভিনেতা হয়ে আমি ওকে খুব শ্রদ্ধা করি। আমার মনে হয়, বাংলা দর্শক ও বাংলা ইন্ড্রাস্ট্রির অনেক বড় ক্ষতি হল। খুব তাড়াতাড়ি চলে গেলেন। ইশ্বর ওর আত্মাকে শান্তি দিক।”

রাহুলের শেষকৃত্যেও সংঘাত

কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য হয়েছে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তাঁর পরিবারের তরফে আগেই জানানো হয়েছিল কোনওরকম আড়ম্বর তাঁরা চান না। দেহ শায়িত রাখা নিয়েও আপত্তি জানায় পরিবার। তাই বিজয়গড়ের বাড়ি থেকেই সরাসরি শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় অভিনেতার দেহ। তবে সেখানেও দেখা গেল সংঘাত !  সায়নী ঘোষ- সহ কয়েকজনকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রাহুলের শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকা বন্ধু, সতীর্থরা ।

রাহুলের মৃত্যু এখনও মেনে নিতে পারছেন না কেউই। অকালে চলে গিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর বন্ধু, সতীর্থ, সহকর্মী থেকে পাড়া-প্রতিবেশী সকলেই বলছেন, এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। সবাই বলছেন, পড়াশোনা জানা খুব ভাল একটা ছেলে, ভাল মনের মানুষ অকালে চলে গেল। সোমবার তমলুক থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয় রাহুলের দেহ। বিকেলে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে তাঁর। উপস্থিত ছিলেন টলিউডের প্রায় সব কলাকুশলীরাই। চোখের জলে প্রিয় ‘বাবিন’-কে বিদায় জানিয়েছেন সকলে। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, বিদীপ্তা চক্রবর্তী- সহ সিনেমা এবং টেলিভিশনের জগতের অনেকেই সজল চোখে এদিন জড়ো হয়েছিলেন শ্মশা চত্বরে। প্রিয় অভিনেতা, প্রিয় লেখক, প্রিয় নাট্যব্যক্তিত্ব ‘রাহুল’-কে শেষবিদায় জানানোর জন্য।

এটা কি ইন্ডাস্ট্রি ??  সত্যি..

বাজারে যারা সব্জি বিক্রি করেন বা যারা রাস্তায় অটো চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের মধ্যে কেউ মারা গেলে একদিন কাজ বন্ধ রাখেন তার সহকর্মীরা, তাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন কিন্তু রাহুলের অন্তোষ্ঠির দিনেও টালিগঞ্জে অবলীলায় জারি ছিল শুটিং। তারমধ্যেও তার সহকর্মীরা এক ঘন্টা বা দু’ঘণ্টার জন্য বিরতি নিয়ে তাকে শ্রদ্ধা যাপন করতে এসেছিলেন। শেষ বিদায় যাত্রায় শামিল হতে এসেছিলেন কিন্তু কোন প্রোডাকশন হাউস বা গিল্ডের তরফ থেকে শুটিং বন্ধ রাখার সৌজন্যতা  দেখাতে পারলেন না। এটাতো নয় যে ধারাবাহিক বা সিনেমা জরুরী পরিষেবার অঙ্গ । যে মানুষটি কর্মক্ষেত্রে প্রাণ দিলেন তার জন্য কি এইটুকু সৌজন্য মানুষ আশা করতে পারে না ?? যদিও বিগত দিনে দেখা গেছে মিছিল মিটিংয়ে বা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শুটিং বন্ধ রেখে অভিনেতা অভিনেত্রীরা এবং কলাকুশলীরা সেখানে হাজির হয়েছেন।

একটি মৃত্যু উঠে এলো বহু প্রশ্ন!

 

প্রোডাকশন হাউসের বিরুদ্ধে অভিযোগ

ঘটনার পর প্রোডাকশন হাউসের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ—

  • নিরাপত্তা প্রোটোকল যথাযথভাবে মানা হয়নি
  • ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না
  • সেটে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পরিষেবা কার্যকর হয়নি

যদিও প্রোডাকশন কর্তৃপক্ষ সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে,
“নির্ধারিত নিয়ম মেনেই শুটিং হচ্ছিল। এটি একটি দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা।”

গিল্ডের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

ঘটনার পর শিল্পী সংগঠন বা গিল্ডের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে—

  • শুটিং সেটে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কতটা নিয়মিত ছিল?
  • ঝুঁকিপূর্ণ শুটিংয়ের ক্ষেত্রে গাইডলাইন কতটা কার্যকর করা হয়েছে?
  • অভিযোগের পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গিল্ডের অন্যতম দায়িত্ব, এবং এখানে কোনো ত্রুটি থাকলে তা গুরুতর বিষয়।

সন্দেহ ও প্রশ্ন

ঘটনার পর থেকেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—

  • জলদৃশ্যের আগে কি যথাযথ সেফটি ড্রিল করা হয়েছিল?
  • উদ্ধারকারী দল কি প্রস্তুত অবস্থায় ছিল?
  • কেন অভিনেতাকে দীর্ঘ সময় জলের মধ্যে থাকতে হল?
  • শুটিংয়ের সময়সীমা ও চাপ কি অতিরিক্ত ছিল?

দুর্ঘটনা নাকি অবহেলা—এই প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের উপরই নির্ভর করছে

 

 

Source ~ inhouse & social media

Leave a Comment

Exit mobile version