Prasongik Bangla

Prasongik Bangla News

ছাদের উপর থেকে পতন, নিভে গেল ব্যঙ্গ-ভাষ্যের এক উজ্জ্বল কণ্ঠ: প্রয়াত পরিচালক অনীক দত্ত, স্তব্ধ টলিপাড়া

রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, বাঙালির নস্ট্যালজিয়া আর সিনেমাপ্রেমকে পর্দায় নতুন ভাষা দিয়েছিলেন তিনি; আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে প্রশ্ন, শোকে চলচ্চিত্র জগৎ

কলকাতা :

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক পরিচিত ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর থেমে গেল আচমকাই। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গের নির্মাতা অনীক দত্ত বুধবার ২৭ মে  দক্ষিণ কলকাতার বহুতল আবাসনের ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর।

প্রাথমিক সূত্রের খবর, ঘটনার পর দ্রুত তাঁকে ঢাকুরিয়ার কাছে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত  ঘোষণা করেন। আকস্মিক এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে বাংলা চলচ্চিত্র মহলে। হাসপাতাল চত্বরে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পৌঁছান বহু অভিনেতা, পরিচালক ও শিল্পী।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার পর তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে এলাকা ঘিরে ফেলেন। বাড়ি থেকে একটি হাতে লেখা নোট উদ্ধার হয়েছে বলেও সূত্রের দাবি, যদিও তার বিষয়বস্তু নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। নোটটি পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক বিশ্লেষণে পাঠানো হয়েছে। পরিবার এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনও বিবৃতি দেয়নি।

অনীক দত্ত—যে নাম শুনলেই বাংলা সিনেমাপ্রেমীদের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে এক অন্যরকম সিনেমা ভাষা। বিজ্ঞাপনের জগত থেকে সিনেমায় এসে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, প্রতিষ্ঠিত নিয়ম না মেনেও নিজস্ব ভাষা তৈরি করা যায়। তাঁর সিনেমায় ছিল রাজনৈতিক কটাক্ষ, মধ্যবিত্ত বাঙালির হাসি-কান্না, স্মৃতি, নস্ট্যালজিয়া এবং সিনেমাকে নিয়েই সিনেমা বানানোর সাহস।

২০১২ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ মুক্তির পর বাংলা সিনেমা যেন এক নতুন ব্যঙ্গাত্মক ভাষা খুঁজে পায়। বাণিজ্যিক সাফল্য এবং সমালোচকদের প্রশংসা—দুই-ই পেয়েছিল ছবিটি। এরপর ‘অশ্চর্য প্রদীপ’, ‘মেঘনাদ বধ রহস্য’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’, ‘ভবিষ্যতের ভূত’, ‘অপরাজিত’ এবং ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’—প্রতিটি কাজেই তিনি নিজের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন।

বিশেষ করে ‘অপরাজিত’ তাঁকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতার পথচলাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি সেই ছবি শুধু সিনেমা ছিল না—ছিল চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রতি এক নির্মাতার প্রেমপত্র।

তার বামপন্থী রাজনৈতিক অবস্থান এবং স্পষ্টভাষী মনোভাব তাঁকে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রেও এনেছে। ২০১৯ সালে তার রাজনৈতিক ব্যঙ্গধর্মী ছবি ‘ভবিষ্যতের ভূত’ মুক্তির পর প্রদর্শন ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। কিন্তু সমর্থক কিংবা সমালোচক—দুই পক্ষই একমত ছিলেন, অনীক দত্ত নিজের মত প্রকাশে কখনও আপস করেননি।

তার পারিবারিক ইতিহাসও কম উল্লেখযোগ্য নয়, দাদু নরেন্দ্র চন্দ্র দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট ব্যাংকার এবং ইউনাইটেড ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। কুমিল্লা থেকে কলকাতা—দত্ত পরিবারের শিকড় বিস্তৃত ছিল ইতিহাস, শিক্ষা এবং জনজীবনের সঙ্গে।

তবে তার আসল পরিচয় থেকে যাবে অন্যত্র—তিনি ছিলেন সেই নির্মাতা, যিনি বাংলা সিনেমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ব্যঙ্গও হতে পারে শিল্প, স্মৃতিও হতে পারে রাজনৈতিক, আর সিনেমাও নিজের ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে পারে।

আজ যখন বাংলা সিনেমা তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ, তখন রয়ে যাচ্ছে তাঁর তৈরি চরিত্র, সংলাপ, হাসি, ব্যথা এবং সেই প্রশ্ন—বাংলা সিনেমার এই ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর এত তাড়াতাড়ি কেন থেমে গেল?

স্ত্রী ও কন্যাকে রেখে গেলেন অনীক দত্ত। কিন্তু পর্দায়, সংলাপে এবং বাংলা সিনেমার স্মৃতিতে  তার উপস্থিতি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version