Prasongik Bangla

Prasongik Bangla News

নেপালে ভয়াবহ বন্যা: হিমবাহ ধসে মুহূর্তে ভেসে গেল জনপদ, মৃত ১২০০-র বেশি, নিখোঁজ হাজার হাজার

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বিপর্যয় | ধ্বংস রাস্তা, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প | উদ্ধারকাজে ভারত ও চিন

প্রাসঙ্গিক by AG -কাঠমান্ডু : হিমালয়ের বুকে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কার্যত বিপর্যস্ত নেপাল। গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চিন সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ভেঙে পড়ার পর তৈরি হয় প্রবল হড়পা বান বা Flash Flood। বরফ, পাথর, কাদা ও জলের ভয়ঙ্কর স্রোত নেমে এসে একের পর এক গ্রাম, রাস্তা, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস করে দেয়।

সর্বশেষ পাওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, নেপালে মৃতের সংখ্যা ১,২০৪-এ পৌঁছেছে, আর এখনও ৪,২০০-রও বেশি মানুষ নিখোঁজ। উদ্ধারকারী দলগুলি বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলিতে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।

কীভাবে শুরু হল বিপর্যয়?

২৬ আগস্ট নেপালের উত্তরাঞ্চলে তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহের নিচের অংশের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতা থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল স্তর নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে।

সেই ধাক্কায় তৈরি হয় প্রবল Ice-Rock Avalanche বা বরফ-পাথরের ধস। ধসের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি ও বরফ নদীতে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সেই জল-ধ্বংসাবশেষের স্রোত ভয়ঙ্কর হড়পা বানের রূপ নেয়।

প্রথমদিকে এই কম্পনকে ভূমিকম্প বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সংস্থা USGS-এর বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সেটি সম্ভবত ভূমিকম্প নয়; বরং হিমবাহ ও পাহাড় ধসের ফলে তৈরি ভূকম্পনজনিত শক্তি ছিল।

কেন ভেঙে পড়ল হিমবাহ?

হিমবাহ ধসের সঠিক কারণ এখনও তদন্তাধীন। তবে বিশেষজ্ঞরা তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দ্রুত বরফ গলা এবং পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা mountain hazards নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বিপর্যয়ের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই অঞ্চলে প্রচুর বরফ গলার সম্ভাবনার কথা স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই ঘটনার কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও গবেষণা শুরু হয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, নির্দিষ্ট এই বিপর্যয়কে একমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।

জাতিসংঘের (United Nations’) পূর্ববর্তী গবেষণাতেও দেখা গিয়েছে, নেপালের হিমবাহগুলি দ্রুত হারে বরফ হারাচ্ছে। ফলে হিমালয় অঞ্চলে ভবিষ্যতে আরও হিমবাহ ধস, হিমবাহ-হ্রদ ফেটে যাওয়া এবং আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বাড়ছে।

কোন কোন এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত?

হিমবাহ ধসের পর জল, কাদা, বরফ ও পাথরের স্রোত নেমে আসে নদী উপত্যকাগুলির দিকে। বিশেষ করে ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নেপালের রাসুওয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা-সহ একাধিক এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু বাড়িঘর সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। রাস্তা ও সেতু ভেসে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বহু প্রত্যন্ত এলাকা।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিও বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছে। একাধিক প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কর্মীরা আটকে পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাঁদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি এবং বিশেষ প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল নামানো হয়েছে।

২০ হাজার বাড়ি পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন

বিপর্যয়ের ধাক্কায় প্রায় ২০ হাজার বাড়ি নতুন করে তৈরি করতে হতে পারে বলে নেপাল সরকারের তরফে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শুধু বাড়িঘর নয়—বিদ্যুৎ, রাস্তা, পানীয় জল, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর নেপালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন।

তিব্বতেও ভয়াবহ প্রভাব

বিপর্যয়টি শুধু নেপালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নেপালের উত্তরে তিব্বতও প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিশেষ করে গিরং (Gyirong) এলাকা এবং নেপাল-চিন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত সংযোগস্থলে উদ্ধারকারী দল পৌঁছে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পায়।

চিনের সরকারি হিসাবেও তিব্বতে বহু মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। একইসঙ্গে নতুন করে হিমবাহ ধস বা জল আটকে তৈরি হওয়া হ্রদ থেকে আরও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

ভারতের বড়সড় উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান

নেপালের এই সংকটে দ্রুত সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে ভারত।

ভারতীয় বিমানবাহিনীর মাধ্যমে নেপালে পাঠানো হয়েছে ওষুধ, জরুরি ত্রাণ সামগ্রী এবং বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম। সর্বশেষ পর্যায়ে একটি ১১ সদস্যের বিশেষ উদ্ধারকারী দল এবং প্রায় ৫.৫ টন প্রয়োজনীয় ওষুধ পাঠানো হয়েছে।

নেপালে আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদেরও উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ দল এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারের জন্যও বিশেষ টানেল রেসকিউ টিম মোতায়েন করা হয়েছে।

 

ভারত-নেপাল সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

এই বিপর্যয় আরও একবার দেখিয়ে দিল যে হিমালয়ের প্রাকৃতিক বিপর্যয় কোনও একটি দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

নেপাল থেকে নেমে আসা নদীগুলির সঙ্গে ভারতের উত্তরাঞ্চলের নদী ব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে নেপালে প্রবল বন্যা হলে তার প্রভাব ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও পড়তে পারে।

বিপর্যয়ের পরে হিমালয় অঞ্চলে রিয়েল-টাইম আবহাওয়া ও নদীর জলস্তর সংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদান, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং যৌথ দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দাবি উঠেছে।

চিনের ভূমিকা ও সীমান্ত সহযোগিতা

চিনও তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। গিরং অঞ্চলে রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে, যাতে উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছনো সহজ হয়।

তবে এই বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। কিছু মহল সীমান্তবর্তী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও পরিকাঠামোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও চিন সেই ধরনের অভিযোগ খারিজ করেছে। চিনের বক্তব্য, বিপর্যয়ের মূল কারণ উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ ও বরফ-পাথরের ধস।

বিজ্ঞানীদের কাছেও এখন মূল প্রশ্ন—হিমবাহ ধসের পিছনে স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক কারণ কতটা এবং ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়নের ভূমিকা কতটা।

‘ত্রাণ নয়, জলবায়ু ন্যায়বিচার’—নেপালের দাবি

এই বিপর্যয়ের পর নেপালে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সামনে এসেছে—Climate Justice বা জলবায়ু ন্যায়বিচার।

নেপাল দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী বড় দেশগুলির তুলনায় নেপালের নিজস্ব কার্বন নিঃসরণ অত্যন্ত কম। অথচ হিমালয়ের বরফ গলা, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং চরম আবহাওয়ার মতো বিপদের সবচেয়ে বড় শিকারগুলির মধ্যে নেপাল অন্যতম।

ফলে কাঠমান্ডুর বক্তব্য, শুধুমাত্র জরুরি ত্রাণ পাঠালেই হবে না; দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু অভিযোজন, ক্ষতিপূরণ এবং বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।

সামনে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, বিপর্যয় এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

হিমালয় অঞ্চলে বহু হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে। কোনও প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়ে গেলে হঠাৎ সেই জল নেমে এসে আবারও ভয়াবহ Glacial Lake Outburst Flood (GLOF) তৈরি করতে পারে।

তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র উদ্ধারকাজ নয়, একইসঙ্গে প্রয়োজন—

  • হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদের নিয়মিত স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ
  • নদীর জলস্তরের রিয়েল-টাইম তথ্য আদানপ্রদান
  • সীমান্তবর্তী এলাকায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা
  • ভূমিকম্প ও পাহাড় ধস পর্যবেক্ষণের জন্য সেন্সর
  • ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন বসতি ও নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ
  • ভারত, নেপাল ও চিনের মধ্যে আরও কার্যকর দুর্যোগ-তথ্য বিনিময়

হিমালয়ের জন্য বড় সতর্কবার্তা

নেপালের এই বিপর্যয় শুধু একটি দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়—এটি গোটা হিমালয় অঞ্চলের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

ভারত, নেপাল, চিন, ভুটান ও পাকিস্তানের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতি কোনও না কোনওভাবে হিমালয়ের জলসম্পদের সঙ্গে যুক্ত। ফলে হিমালয়ে একটি বড় হিমবাহ ধস বা আকস্মিক বন্যার প্রভাব কয়েকটি দেশের সীমানা পেরিয়ে যেতে পারে।

নেপালের ক্ষেত্রে এখন প্রথম লক্ষ্য নিখোঁজদের উদ্ধার, মৃতদের শনাক্তকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া। এরপর শুরু হবে আরও কঠিন কাজ—ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর, রাস্তা, সেতু ও পরিকাঠামো পুনর্গঠন।

কিন্তু এই বিপর্যয় একটি প্রশ্ন রেখে গেল—

পরবর্তী হিমবাহ ধস বা হড়পা বান আসার আগেই কি হিমালয়ের দেশগুলি একসঙ্গে প্রস্তুত হতে পারবে?

সময়ই দেবে সেই প্রশ্নের উত্তর।

 

 

সূত্র: Reuters, AP, Al Jazeera এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সর্বশেষ প্রতিবেদন।

ফটো : সমাজিক মাধ্যম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version