Prasongik Bangla

Prasongik Bangla News

২৯ বছর পর ডার্বিতে সেই ৪-১! এডমুণ্ডের হ্যাটট্রিকে মোহনবাগানকে হারিয়ে ডুরান্ড চ্যাম্পিয়ন ইস্টবেঙ্গল

২২ বছরের অপেক্ষার অবসান, ১৭তম ডুরান্ড কাপ জিতে ইতিহাসের পাতায় লাল-হলুদ

by AG

কলকাতা, ২৪ আগস্ট: ডার্বির মঞ্চে ইতিহাস যেন আবার ফিরে এল। ১৯৯৭ সালের সেই ৪-১—২৯ বছর পর একই ব্যবধানে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকে হারিয়ে ডুরান্ড কাপের ১৩৫তম সংস্করণের চ্যাম্পিয়ন হল ইস্টবেঙ্গল এফসি। ২৩ আগস্ট কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে লাল-হলুদের জয়ের নায়ক এডমুণ্ড লালরিনডিকা। প্রথমার্ধেই দুরন্ত হ্যাটট্রিক করে ম্যাচের রং বদলে দেন তিনি।

এই জয়ের সঙ্গে দীর্ঘ ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটল ইস্টবেঙ্গলের। একই সঙ্গে ডুরান্ড কাপে তাদের শিরোপার সংখ্যা পৌঁছল ১৭-তে, যা প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সর্বাধিক শিরোপার রেকর্ডের সমান।

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে ইস্টবেঙ্গল। মাত্র ৯ মিনিটেই বিপিন সিংয়ের গোলে এগিয়ে যায় লাল-হলুদ। এরপর শুরু হয় এডমুণ্ডের দাপট। ১১ মিনিটের মাথায় দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান ২-০ করেন তিনি। ২১ মিনিটে মোহনবাগানের রক্ষণভাগকে বোকা বানিয়ে এবং গোলকিপার বিশাল কাইথকে পরাস্ত করে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন এডমুণ্ড।

৩-০ পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়েনি মোহনবাগান। ৩২ মিনিটে মনবীর সিং গোল করে ব্যবধান কমিয়ে ৩-১ করেন। সেই গোলের পর সবুজ-মেরুন শিবিরে ম্যাচে ফেরার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বিরতির ঠিক আগেই সেই আশা কার্যত শেষ করে দেন এডমুণ্ড।

৪৪ মিনিটে জয় গুপ্তের বাড়ানো বল থেকে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে নিজের হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ করেন তিনি। প্রথমার্ধ শেষ হয় ৪-১ ব্যবধানে। ডার্বির মঞ্চে প্রথম ৪৫ মিনিটেই এডমুণ্ডের হ্যাটট্রিক যেন ম্যাচের ভাগ্য লিখে দেয়।

দ্বিতীয়ার্ধে বলের দখল বাড়ায় মোহনবাগান। সাহাল আবদুল সামাদ, কিয়ান নাসিরিদের মাঠে নামিয়ে আক্রমণের ধার বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের সংগঠিত রক্ষণভাগের সামনে বারবার আটকে যায় সবুজ-মেরুনের আক্রমণ। বরং পাল্টা আক্রমণে আরও গোলের সুযোগ তৈরি করে লাল-হলুদ।

১৯৯৭-এর স্মৃতি ফিরল ২০২৬-এ

ডার্বিতে ৪-১ স্কোরলাইন বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে নিছক একটি ফল নয়। এই ব্যবধান শুনলেই ফিরে আসে ১৯৯৭ সালের ১৩ জুলাইয়ের সেই ঐতিহাসিক ফেডারেশন কাপ সেমিফাইনাল। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে রেকর্ড দর্শকের সামনে সেবারও মোহনবাগানকে ৪-১ গোলে হারিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল।

সেই ম্যাচে নাজিমুল হক গোলের সূচনা করেছিলেন। এরপর তিন গোল করে ডার্বির চিরকালীন নায়ক হয়ে উঠেছিলেন বাইচুং ভুটিয়া। অমল দত্তের বিখ্যাত ‘ডায়মন্ড সিস্টেম’-এর বিরুদ্ধে পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইস্টবেঙ্গল সেদিন যে দাপট দেখিয়েছিল, তারই যেন পুনরাবৃত্তি ঘটল ২৯ বছর পর।

তবে নায়ক বদলে গিয়েছে। সেদিন ছিলেন ‘পাহাড়ি বিছে’ বাইচুং। এবার ডার্বির নতুন রূপকথার লেখক এডমুণ্ড লালরিনডিকা।

দুই ম্যাচ, একই প্রতিপক্ষ, একই মাঠ, একই ৪-১ ফলাফল এবং ইস্টবেঙ্গলের এক ফুটবলারের হ্যাটট্রিক—দুই সময়ের মধ্যে অদ্ভুত এক যোগসূত্র তৈরি করে দিল এই ডুরান্ড কাপ ফাইনাল।

২২ বছরের অপেক্ষার অবসান

ইস্টবেঙ্গলের কাছে এই জয় শুধুমাত্র ডার্বি জয় নয়, এটি দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের মুহূর্ত। ২২ বছর পর ফের ডুরান্ড কাপের ট্রফি উঠল লাল-হলুদ শিবিরে। ১৭তম ডুরান্ড কাপ জিতে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি আবারও নিজেদের নাম লিখল ইতিহাসে।

ডুরান্ড কাপের ইতিহাসও কম গৌরবময় নয়। ১৮৮৮ সালে শিমলায় শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ফুটবল টুর্নামেন্ট। প্রথমদিকে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এটি দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। কলকাতা ও পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের ফুটবলপ্রেমী অঞ্চলে প্রতিযোগিতার বিস্তার ডুরান্ড কাপকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

ইতিহাস শুধু ট্রফিতে নয়, আবেগেও

ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। কখনও কখনও একটি ম্যাচ হয়ে ওঠে স্মৃতি, পরিচয় এবং প্রজন্মের আবেগের প্রতীক। ১৯৯৭-এর ৪-১-এর স্মৃতি যাঁরা বুকে ধরে রেখেছিলেন, তাঁদের সামনে ২০২৬-এ সেই একই স্কোরলাইন যেন পুরনো এক গল্পকে নতুন করে লিখে দিল।

সবকিছু কেড়ে নেওয়া যায়—ভিটেমাটি, বসতবাড়ি, ঠিকানা। কিন্তু কেড়ে নেওয়া যায় না একটি জাতির আত্মপরিচয়, কেড়ে নেওয়া যায় না মাথা উঁচু করে লড়াই করার জেদ। যে ইতিহাস রক্তে লেখা, যে আবেগ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে, তার কোনও কাঁটাতার হয় না।

সল্টলেকের মাঠে ২৩ আগস্ট সেই আবেগই যেন নতুন করে প্রমাণ করল ইস্টবেঙ্গল। ২৯ বছর পর ফিরল ৪-১, ফিরল হ্যাটট্রিকের গল্প—শুধু বাইচুংয়ের জায়গায় এবার নাম এডমুণ্ড লালরিনডিকা।

ইস্টবেঙ্গল ৪-১ মোহনবাগান।
ডার্বির ইতিহাসে আরও এক লাল-হলুদ অধ্যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version