Prasongik Bangla

Prasongik Bangla News

উত্তমের ১০০: পর্দার মহানায়ক, বাঙালির চিরকালের আবেগ—জন্ম থেকে কিংবদন্তি হয়ে ওঠার সম্পূর্ণ কাহিনি

Uttam Kumar Birth Centenary: ১০০ বছর পরেও কেন উত্তম কুমারই ‘মহানায়ক’? প্রধানমন্ত্রী মোদীর শ্রদ্ধা, ২৫ কোটির ফিল্ম সেন্টার—জন্মশতবর্ষে ফিরে দেখা এক অমর অধ্যায় 

AG কলকাতা: ক্যালেন্ডারের পাতায় ১০০ বছর। কিন্তু বাঙালির হৃদয়ে উত্তম কুমারের বয়স যেন আজও সেই তরুণ নায়কেরই—সাদা-কালো পর্দায় মায়াবী হাসি, অনায়াস ব্যক্তিত্ব আর সংলাপ বলার সেই নিজস্ব ভঙ্গি। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্ম নেওয়া অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মহানায়ক’—একটি নাম, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়।

২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হল। জন্মশতবর্ষে ফের একবার প্রমাণিত হল—উত্তম কুমার কোনও নির্দিষ্ট সময়ের নায়ক নন। তিনি প্রজন্ম পেরিয়ে যাওয়া এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও জন্মশতবর্ষে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, উত্তম কুমারের কালজয়ী অভিনয় এখনও প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে।

অরুণ থেকে উত্তম—শুরুটা কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না

উত্তম কুমারের আসল নাম ছিল অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই অভিনয় ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। মহানায়ক উত্তম কুমার জীবনের প্রথম অভিনয় শুরু হয়েছিল মঞ্চে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে গয়াসুর নামক নাটকে শিশুশিল্পী হিসাবে I উত্তম কুমারের ছোটবেলা থেকেই পরিবারের নাট্য চর্চার মধ্যে বড় হয়েছেন তার পরিবার ও কাকার উদ্যোগে গড়া “সুহৃদ সমাজ” মাধ্যমে নাট্যচর্চার সাথে তার পরিচয় ঘটে, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ‘গয়াসুর’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর মঞ্চে প্রথম পা রাখার কথা জানা যায়।

স্কুলজীবনে নাটকের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বাড়ে। পরবর্তীতে তিনি গোয়েঙ্কা কলেজ অফ কমার্স অ্যান্ড বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে পড়াশোনা করেন। কিন্তু সংসারের আর্থিক পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা শেষ না করে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টে কেরানির চাকরি নিতে হয় তাঁকে। সেই সময়েই চলতে থাকে থিয়েটার ও অভিনয়ের সাধনা।

অর্থাৎ, যাঁকে পরবর্তীকালে বাংলা সিনেমার সর্বকালের অন্যতম বড় তারকা হিসেবে দেখা হয়েছে, তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল একেবারে সাধারণ চাকরিজীবীর মতো।

সিনেমায় প্রথম পদক্ষেপ, কিন্তু পরপর ব্যর্থতা

১৯৪৮ সালে নীতিন বসুর পরিচালনায় ‘দৃষ্টিদান’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক। এর আগে ‘মায়াডোর’ নামে একটি ছবিতে কাজ করলেও সেটি মুক্তি পায়নি।

কিন্তু ‘দৃষ্টিদান’ থেকেই সাফল্য আসেনি। একের পর এক ছবি ব্যর্থ হওয়ায় তখনকার দিনে তাঁকে ব্যঙ্গ করে বলা হত—‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’।

যে মানুষটি পরবর্তীতে বাংলা সিনেমার সবচেয়ে বড় ‘হিট মেশিন’ হয়ে উঠবেন, তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল এমনই কঠিন। এমনকী একটা সময় তিনি সিনেমা ছেড়ে আবার পোর্ট ট্রাস্টের চাকরিতে ফিরে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি।

 

‘বসু পরিবার’ থেকে বদলে গেল গল্প

১৯৫২ সালের ‘বসু পরিবার’ ছবিকে তাঁর প্রথম বড় সাফল্যের অন্যতম মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। তার পরের বছর ১৯৫৩ সালে মুক্তি পায় ‘সাড়ে চুয়াত্তর’।

আর সেখানেই তৈরি হয় বাংলা সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি জুটি—উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন।

‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর সাফল্যের পর ১৯৫৪ সালের ‘অগ্নিপরীক্ষা’ তাঁদের জনপ্রিয়তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। উত্তম-সুচিত্রা হয়ে ওঠেন বাংলা সিনেমার রোম্যান্টিক যুগের সবচেয়ে বড় দুই নাম।

এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

শুধু রোম্যান্টিক নায়ক নন—অভিনেতা উত্তমের আসল বিস্তার এখানেই

উত্তম কুমারকে শুধু ‘রোম্যান্টিক হিরো’ হিসেবে দেখলে তাঁর শিল্পীসত্তার একটা বড় অংশ অদেখাই থেকে যায়।

‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘সাগরিকা’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘নায়ক’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘সপ্তপদী’, ‘বিপাশা’, ‘নিশিপদ্ম’—বিভিন্ন চরিত্রে তিনি দেখিয়েছেন তাঁর অভিনয়ের বিস্তার কতটা গভীর।

বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ উত্তম কুমারের অভিনয়জীবনের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। ছবিতে চলচ্চিত্র তারকা অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধায় ‘নায়ক’-এর কথা উল্লেখ করেছেন।

জাতীয় পুরস্কারে ইতিহাস তৈরি

উত্তম কুমারের অভিনয় শুধু দর্শকের ভালোবাসা পায়নি, জাতীয় স্তরেও স্বীকৃতি পেয়েছিল।

১৯৬৭ সালে প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার চালু হওয়ার পর উত্তম কুমার সেই পুরস্কারের প্রথম প্রাপক হন। ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ এবং ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে তাঁর অভিনয়ের জন্য এই সম্মান দেওয়া হয়।

অর্থাৎ, ‘মহানায়ক’ শুধু জনপ্রিয়তার অভিধা নয়—অভিনয় দক্ষতারও জাতীয় স্বীকৃতি।

অভিনেতার বাইরে উত্তম ছিলেন পরিচালক, প্রযোজক, সঙ্গীতশিল্পীও

উত্তম কুমারের প্রতিভা শুধু অভিনয়ে আটকে ছিল না। তিনি পরিচালনা, প্রযোজনা, সঙ্গীত পরিচালনা এবং প্লেব্যাকেও কাজ করেছেন।

নিজের প্রযোজনায় একাধিক সফল ছবি তৈরি করেছিলেন। ‘বন পলাশীর পদাবলী’-র মতো ছবির সঙ্গে তাঁর সৃজনশীল ভূমিকা বাংলা সিনেমায় তাঁর বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় দেয়।

এই কারণেই উত্তম কুমারকে শুধু তারকা বললে কম বলা হয়—তিনি ছিলেন এক অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান।

পর্দার বাইরেও ছিল অন্য উত্তম

উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার অন্যতম রহস্য ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক, সংযত এবং আকর্ষণীয়। তিনি কখনও অতিরিক্ত নাটকীয়তার মাধ্যমে নায়ক হওয়ার চেষ্টা করেননি—বরং স্বাভাবিক অভিনয়, চোখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর এবং শরীরী ভাষার মাধ্যমে চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতেন।

তিনি ছিলেন খেলাধুলাতেও পারদর্শী। ছোটবেলায় সাঁতারে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন এবং ভবানীপুর সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনে ১০০ ইয়ার্ড ফ্রিস্টাইলে টানা তিন মরসুম চ্যাম্পিয়ন হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। ফুটবলও খেলতেন এবং মোহনবাগানের সমর্থক ছিলেন।

অর্থাৎ, পর্দার ‘মহানায়ক’-এর ভিতরে লুকিয়ে ছিল এক ক্রীড়াপ্রেমী, থিয়েটারকর্মী এবং সংস্কৃতিমনস্ক কলকাতার যুবক।

মহানায়ক নামটি কীভাবে হয়ে উঠল পরিচয়ের অংশ?

বাংলা সিনেমায় ‘মহানায়ক’ শব্দটি উত্তম কুমারের সঙ্গে এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় যে পরবর্তীতে তাঁর নামের সঙ্গে এই অভিধাই প্রায় স্থায়ী হয়ে যায়।

১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিলেন তিনি। তাঁর ছবি মানেই ছিল দর্শকের ভিড়, প্রযোজকের আস্থা এবং বিপুল জনপ্রিয়তা।

সমকালীন অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী ও শিল্পী তাঁর তারকাখ্যাতির প্রশংসা করেছেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল—তিনি কেবল সিনেমার নায়ক হয়ে থাকেননি, বাঙালির সংস্কৃতির অংশ হয়ে গিয়েছিলেন।

মাত্র ৫৩ বছরেই থেমে গেল পথচলা

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে প্রয়াত হন উত্তম কুমার।

সেই মৃত্যু বাংলা চলচ্চিত্রে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে। তিনি তখনও কাজ করছিলেন। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবির শুটিং চলাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনাবসান হয় কলকাতায়।

একজন অভিনেতার মৃত্যু হয়েছিল, কিন্তু ‘উত্তম কুমার’ নামটির মৃত্যু হয়নি।

মৃত্যুর পরেও থামেনি উত্তমের পথচলা

উত্তম কুমারের মৃত্যুর কয়েক দশক পরেও তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই অটুট যে কলকাতার টালিগঞ্জের মেট্রো স্টেশন তাঁর নামে নামাঙ্কিত হয়েছে—‘মহানায়ক উত্তম কুমার’।

২০০৯ সালে ভারতীয় ডাক বিভাগ তাঁর স্মরণে ডাকটিকিট প্রকাশ করে। তাঁর স্মৃতিতে পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘মহানায়ক সম্মান’ পুরস্কারও চালু করে।

আরও বিস্ময়কর হল, নতুন প্রজন্মের সিনেমাতেও উত্তম কুমারের উপস্থিতি ফিরে এসেছে। তাঁর পুরনো ছবির ফুটেজ ও VFX ব্যবহার করে ২০২৪ সালের ‘অতি উত্তম’-এর মতো ছবিতে তাঁকে নতুনভাবে দর্শকের সামনে হাজির করা হয়েছে।

১০০ বছরেও কেন উত্তম কুমার এতটা প্রাসঙ্গিক?

কারণ উত্তম কুমার কোনও একটি সময়ের সঙ্গে আটকে থাকা নায়ক নন।

তিনি প্রেমের নায়ক, পারিবারিক গল্পের নায়ক, সামাজিক চরিত্রের অভিনেতা, মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগা মানুষ—সবকিছুই হতে পেরেছিলেন।

তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল স্বাভাবিকতা। তাঁর হাসি, তাঁর চোখ, তাঁর হাঁটার ভঙ্গি, তাঁর সংলাপ—সবকিছু মিলে তৈরি হয়েছিল এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে নকল করা যায়, কিন্তু পুনরাবৃত্তি করা যায় না।

সেই কারণেই শতবর্ষে দাঁড়িয়েও ‘উত্তম’ কোনও অতীতের স্মৃতি নয়—তিনি এখনও বর্তমান।

জন্মশতবর্ষে নতুন উপহার: ₹২৫ কোটির ‘মহানায়ক উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’

উত্তম কুমারের ১০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিউ টাউনে ₹২৫ কোটি ব্যয়ে ‘মহানায়ক উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে মিঠুন চক্রবর্তী, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত-সহ চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রস্তাবিত কেন্দ্রটিতে থাকবে—

  • ৭৫০ আসনের দুটি সিনেমা হল
  • ১,০০০ আসনের অডিটোরিয়াম
  • ওপেন-এয়ার থিয়েটার
  • ক্যাফেটেরিয়া
  • ফিল্ম প্রোডাকশন স্টুডিও
  • অ্যানিমেশন ও VFX-এর সুবিধা
  • গেমিং ও কমিকস সংক্রান্ত পরিকাঠামো
  • Extended Reality (XR) সুবিধা
  • পোস্ট-প্রোডাকশন ল্যাবরেটরি

অর্থাৎ, মহানায়ককে শুধু স্মরণ নয়—তাঁর নামে নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্রকর্মীদের জন্য ভবিষ্যতের পরিকাঠামো তৈরির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

রাজনীতির ঊর্ধ্বে ‘উত্তম’

 

উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনে শামিল বাংলা বিনোদনদুনিয়া। বৃহস্পতিবার সকালে টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনচত্বরে উত্তমকুমারের মূর্তিতে মালা দিয়ে বিশেষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অভিনেতার মূর্তিতে এ দিন মালা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে দেব, জিৎ, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়-সহ টলিউডের প্রথম সারির একাধিক মুখ উপস্থিত।

এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টলিপাড়ার একাধিক চেনা মুখ। ছিলেন রঞ্জিত মল্লিক, হরনাথ চক্রবর্তী, গৌতম ঘোষ, সুদেষ্ণা রায়-সহ অনেকেই। উপস্থিত ছিলেন রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী-সহ একাধিক বিধায়ক। ছিলেন উত্তমকুমারের পরিবারের সদস্যেরাও। মাল্যদান করেন মুখ্যমন্ত্রী-সহ সকল অভিনেতা-অভিনেত্রী। মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয়, গোটা ভারতবর্ষের চলচ্চিত্র তথা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে, একটি অত্যন্ত আনন্দের দিন। অত্যন্ত গর্বের দিন।

আর এই উদ্‌যাপনের সবচেয়ে বড় বার্তাই হয়তো এটাই—উত্তম কুমার কোনও রাজনৈতিক পরিচয়ের নন; তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শ্রদ্ধা থেকে শুরু করে রাজ্য সরকারের জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন—দুই ক্ষেত্রেই ফিরে এসেছে একই উপলব্ধি: উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তা কোনও দল, মত বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

টালিগঞ্জের মহানায়ক থেকে হিন্দি সিনেমাতেও উত্তমের ছাপ

উত্তম কুমারের জাদু শুধু বাংলা সিনেমাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হিন্দি ছবিতেও নিজের অভিনয় প্রতিভার ছাপ রেখেছিলেন তিনি। ‘Chhoti Si Mulaqat’ (১৯৬৭)-এ বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে অভিনয় দিয়ে হিন্দি সিনেমায় তাঁর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি তৈরি হয়।

এরপর ‘Amanush’ (১৯৭৫) ও ‘Anand Ashram’ (১৯৭৭)-এর মতো বাংলা-হিন্দি দ্বিভাষিক ছবিতে অভিনয় করে সর্বভারতীয় দর্শকের কাছেও পৌঁছে যান মহানায়ক। শর্মিলা ঠাকুর, অশোক কুমারদের মতো তারকাদের সঙ্গে তাঁর কাজ তৈরি করেছিল বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের এক অনন্য সেতুবন্ধন।

তবে বলিউডে কাজ করলেও উত্তম কুমারের আসল ঠিকানা ছিল কলকাতার টালিগঞ্জ। তিনি বলিউডের তারকা হতে যাননি—বরং বাংলা সিনেমার মহানায়ক হয়েই সারা ভারতের দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।

বাংলার উত্তম, ভারতের গর্ব—১০০ বছর পরেও তাই তিনি চিরকালীন।

উত্তম কুমার: ১০০ বছরের এক ঝলক

জন্ম: ৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬, কলকাতা
আসল নাম: অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়
প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি: ‘দৃষ্টিদান’ — ১৯৪৮
প্রথম বড় সাফল্য: ‘বসু পরিবার’ — ১৯৫২
উত্তম-সুচিত্রা জুটির সূচনা: ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ — ১৯৫৩
বড় ব্রেকথ্রু: ‘অগ্নিপরীক্ষা’ — ১৯৫৪
জাতীয় পুরস্কার: ১৯৬৭ সালে প্রথম জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ অভিনেতা
সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য ছবি: ‘নায়ক’
মৃত্যু: ২৪ জুলাই ১৯৮০
মৃত্যুকালে বয়স: ৫৩ বছর
মহানায়ক উত্তম কুমার মেট্রো স্টেশন: টালিগঞ্জ, কলকাতা
জন্মশতবর্ষ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেষ কথা

একজন অভিনেতা জন্মান।
একজন তারকা তৈরি হন।
কিন্তু একজন মহানায়ক হয়ে ওঠেন দর্শকের ভালোবাসায়।

উত্তম কুমারের ক্ষেত্রে সেই ভালোবাসা এক প্রজন্মে থেমে থাকেনি। ১৯৫০-এর দশকের দর্শক যেমন তাঁকে ভালোবেসেছেন, তেমনই আজকের প্রজন্মও ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘নায়ক’ কিংবা ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করছে।

তাই ১০০ বছর পরেও প্রশ্নটা একই—

উত্তম কুমার কি সত্যিই অতীত?

বাঙালির উত্তর একটাই—

না। উত্তম কুমার কোনও অতীত নন।
তিনি বাংলা সিনেমার চিরকালের বর্তমান
।

— প্রাসঙ্গিক

 

Photo Credit: Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version