Prasongik Bangla

Prasongik Bangla News

কলকাতার কালীপুজো: ইতিহাস, ঐতিহ্য, ডাকাত কালী ও ক্লাব সংস্কৃতির উন্মাদনায় মেতে উঠছে শহর

দীপাবলির রাতে আলোর ঝলকানিতে শ্যামা মায়ের আরাধনায় মুখরিত গোটা বাংলা। রাজবাড়ি থেকে ক্লাব, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে এবারও উজ্জ্বল কলকাতার কালীপুজো।

বাংলার কালীপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক আবেগ, এক সামাজিক সংহতি। ইতিহাসের পাতায় শিকড় গেড়ে থাকা এই পুজো আজ পরিণত হয়েছে শিল্প, থিম ও সৃষ্টিশীলতার মহোৎসবে। ডাকাত কালী থেকে শুরু করে আধুনিক ক্লাব পুজো — কলকাতার এই ঐতিহ্য আজও অম্লান।

কলকাতা, ২১ অক্টোবর: দীপাবলির রাত মানেই বাংলার কালীপুজো। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি কোণ আলোয় ভরে ওঠে। শ্যামা মায়ের আরাধনায় মুখরিত হয় সমগ্র বাংলা। তবে এটি শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং আজ এটি এক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক উৎসব, বিশেষ করে কলকাতার ক্লাব পুজোগুলির হাত ধরে।

ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলায় কালীপুজোর প্রচলন শুরু হয় ১৮শ শতকে। নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও শোভাবাজার রাজবাড়ির রাজা নবকৃষ্ণ দেব প্রথম বৃহৎ পরিসরে কালীপুজো জনপ্রিয় করে তোলেন। রাজবাড়ির পুজো থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় পাড়াভিত্তিক পূজা এবং পরে ক্লাব সংস্কৃতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্লাব পুজোগুলিই কলকাতার কালীপুজোকে আজ আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে।

কালীপুজোর একটি বিশেষ দিক হল এর মধ্যরাত্রির পূজা। তান্ত্রিক রীতিতে সম্পন্ন হয় এই আরাধনা, যেখানে ধূপ, দীপ ও ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে মা কালীকে আহ্বান করা হয়। এই পূজা কেবল বিশ্বাস নয়, এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।

ছবি সৌজন্যে : বৈশাখী ক্লাব, বেলগাছিয়া মেট্রো

বাংলার কালীপুজোর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জুড়ে আছে ‘ডাকাত কালী’ উপাসনা। প্রাচীনকালে ডাকাতরা বিশ্বাস করত, মা কালী তাঁদের শক্তি ও সাহস দান করেন। তাই ডাকাতেরা অভিযান শুরুর আগে মায়ের পুজো দিতেন, মন্ত্রোচ্চারণ করতেন এবং তাঁর আশীর্বাদ কামনা করতেন। তাঁদের আরাধ্য ছিল রুদ্র, ভয়ঙ্কর ও শক্তিময় কালী — যিনি বিপদে রক্ষা করেন ও সাফল্য দান করেন। সেই ডাকাত কালী পূজা থেকেই বাংলায় শক্তি আরাধনার এক বিশেষ ধারা গড়ে ওঠে, যা আজও গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা ক্লাবগুলো কালীপুজোকে নতুন মাত্রা দেয়। ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয় শিল্প, থিম ও সমাজসচেতন বার্তা। আজ নামী ক্লাবের পুজো শহরের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিটি প্যান্ডেলে দেখা যায় নতুন ভাবনা, ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার দারুণ মেলবন্ধন।

দীপাবলির রাতে কলকাতা কার্যত জেগে থাকে। মানুষ প্যান্ডেল থেকে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ায়, মন্দিরে ভিড় জমায়, বাজির আলোয় মুখরিত হয় শহর। কালিঘাট ও দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে উপচে পড়ে দর্শনার্থীদের ভিড়। অন্যদিকে ক্লাব পুজোগুলিতে এখন দেখা যায় পরিবেশবান্ধব উপকরণে তৈরি প্যান্ডেল, আলোয় সাজানো থিমভিত্তিক শিল্পকর্ম ও সামাজিক বার্তা।

আজকের কালীপুজো তাই শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, এটি এক শহুরে উৎসব, যেখানে ইতিহাস, ঐতিহ্য, শক্তি ও সৃষ্টিশীলতার এক অনবদ্য সংমিশ্রণ ঘটে। রাজবাড়ির গম্ভীর পূজা থেকে ক্লাবের ঝলমলে প্যান্ডেল— সর্বত্রই প্রতিধ্বনিত হয় একটিই নাম, “জয় মা কালী।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version