মাসান হোলি : চিতাভস্মে রঙ খেল্ল্য কাশী, মৃত্যুক্ষেত্রেই ভক্তির উল্লাস

বারাণসী, উত্তরপ্রদেশ:
ভারতের অন্যান্য প্রান্তে যখন আবির-গুলালের রঙে মেতে ওঠে হোলির উৎসব, তখন প্রাচীন নগরী Varanasi-তে পালিত হয় এক সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং রহস্যময় ঐতিহ্য—  মাসান হোলি। এখানে রঙ নয়, চিতার ভস্ম দিয়েই উদযাপিত হয় হোলি।

বারাণসীর কাশীর ( Kashi ) বিখ্যাত  ‘মাসান হোলি’( Masan Holi ) । সারা দেশ যখন আবির-জলরঙে ব্যস্ত, বারাণসীর মাসান হোলিতে তখন ব্যবহার হয় শ্মশানের ছাই, বাবা মাসান নাথ মন্দিরের প্রাঙ্গণে এই খেলায় মেতে ওঠেন অঘোরীরা।

২০২৬ সালেও সেই প্রাচীন রীতি মেনে কাশীর দুই ঐতিহাসিক শ্মশানঘাট— Manikarnika Ghat এবং Harishchandra Ghat-এ অনুষ্ঠিত হয় এই ব্যতিক্রমী উৎসব। শ্মশানের চিতাভস্ম মেখে সাধু-সন্ন্যাসীরা নৃত্য ও কীর্তনে মেতে ওঠেন, চারদিকে ধ্বনিত হয় “হর হর মহাদেব” ধ্বনি।

ঐতিহ্যের শিকড়

মাসান হোলির এই প্রথা জড়িয়ে রয়েছে Lord Shiva-র উপাসনার সঙ্গে। পুরাণ মতে, শিব শ্মশানবাসী দেবতা এবং তিনি ভস্মকে পবিত্র বলে মনে করেন। কাশীতে বিশ্বাস করা হয়, রংভরি একাদশী-র পর শিব তাঁর ভক্তদের নিয়ে শ্মশানে এসে হোলি খেলেন।

সেই বিশ্বাস থেকেই শতাব্দী প্রাচীন এই আচার পালিত হয়ে আসছে। ভক্তরা চিতাভস্ম মেখে শিবের প্রতি ভক্তি প্রকাশ করেন এবং জীবনের চূড়ান্ত সত্য—মৃত্যুর অনিবার্যতা—কে স্মরণ করেন।

আধ্যাত্মিক দর্শন

কাশীর আধ্যাত্মিক দর্শনে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়, বরং মুক্তির পথ। তাই শ্মশান এখানে ভয়ের স্থান নয়, বরং মোক্ষের দ্বার বলে মনে করা হয়। মাসান হোলির মাধ্যমে সেই দর্শনই প্রতিফলিত হয়—জীবন যেমন উৎসবমুখর, তেমনি মৃত্যুও অনিবার্য।

 

২০২৬ সালের আয়োজন

এবারের মাসান হোলিতে শতাধিক সাধু, ভক্ত এবং দর্শনার্থী উপস্থিত ছিলেন। শ্মশানঘাটে যাতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ব্যাহত না হয়, সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পুলিশের নজরদারির মধ্যেই সীমিত আকারে অনুষ্ঠিত হয় এই উৎসব।

সাধু-সন্ন্যাসীরা চিতাভস্ম শরীরে মেখে ঢোল-নগাড়ার তালে নৃত্য করেন এবং শিবস্তব গেয়ে উৎসবকে ভক্তিময় করে তোলেন।

পর্যটকদের আকর্ষণ

গত কয়েক বছরে মাসান হোলি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। অনন্য এই ঐতিহ্যের ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় কৌতূহল বাড়ছে দর্শনার্থীদের মধ্যে।

তবে স্থানীয় ধর্মগুরু ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার জানানো হয়েছে, এই অনুষ্ঠান কেবলমাত্র দর্শনীয় নয়—এটি কাশীর শতাব্দী প্রাচীন আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির অংশ।

জীবন-মৃত্যুর সীমান্তে এক উৎসব

অগ্নিশিখা, গঙ্গার তীর এবং “হর হর মহাদেব” ধ্বনির মধ্যে অনুষ্ঠিত  মাসান  হোলি যেন কাশীর এক অনন্য পরিচয়। রঙের উৎসবকে ছাপিয়ে এখানে জীবনের গভীর দর্শনই হয়ে ওঠে প্রধান বার্তা—শেষ পর্যন্ত সবই ভস্মে মিলিয়ে যায়।

Leave a Comment

Exit mobile version