ফুটবলের শহর কলকাতায় স্বপ্ন ভেঙেছে হাজার হাজার ভক্তের। ১৪ হাজার টাকার টিকিট কেটে সল্টলেক স্টেডিয়ামে গিয়েও লিওনেল মেসিকে এক নজর দেখতে পেলেন না দর্শকরা। মাত্র ১৫ মিনিটের উপস্থিতিতেই ক্ষোভ, ভাঙচুর ও রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ল বহু প্রতীক্ষিত ‘গোট ট্যুর’।
ফুটবলের শহর কলকাতায় যেদিন লিওনেল মেসির পা রাখার কথা ছিল, সেই দিনটি ইতিহাস হয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু শনিবার সল্টলেক স্টেডিয়ামে যা ঘটল, তা রয়ে গেল এক চরম বিশৃঙ্খলা, হতাশা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত হিসেবে। “GOAT Tour” -এর অংশ হিসেবে মেসির কলকাতা সফর শেষ পর্যন্ত পরিণত হল ক্ষোভ, ভাঙচুর ও রাজনৈতিক বিতর্কে।
প্রায় ৮০ হাজার ফুটবলপ্রেমী ভিড় করেছিলেন যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। অনেকেই ১৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়ে টিকিট কিনেছিলেন প্রিয় ফুটবল তারকাকে এক নজর দেখার আশায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, মেসি স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতেই রাজনীতিবিদ ও ভিআইপিরা ঘিরে থাকলেন। সাধারণ দর্শকদের জন্য ছিল না কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি, না হাত নাড়া, না স্টেডিয়াম ল্যাপ। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই তিনি স্টেডিয়াম ছেড়ে চলে যান।
এই ঘটনায় দর্শকদের হতাশা দ্রুত রূপ নেয় ক্ষোভে। স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে শুরু হয় দুয়োধ্বনি। চেয়ার ভাঙা, বোতল ছোড়া, মাঠে ঢুকে পড়া—সব মিলিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, বাধ্য হয়ে পুলিশকে নামাতে হয় র্যাফ ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ বাহিনী।
এর আগেই সকালে শহরে নিজের মূর্তি উন্মোচন করেছিলেন মেসি। কিন্তু সল্টলেক স্টেডিয়ামে তাঁর সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি দেখে বহু দর্শক বুঝতেই পারেননি তিনি আদৌ মাঠে এসেছিলেন কি না। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতেই আয়োজকদের তরফে মেসিকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয় এবং তিনি হায়দরাবাদের উদ্দেশে রওনা দেন।
এই ঘটনায় রাজ্য সরকার প্রবল চাপে পড়ে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে এমন একটি আন্তর্জাতিক স্তরের অনুষ্ঠান ব্যর্থ হওয়ায় প্রশাসনকে নিশানা করে বিরোধীরা । তারা একে “বিশ্বমঞ্চে বাংলার অপমান” বলে আখ্যা দেয় এবং রাজ্য সরকারের চরম ব্যর্থতার অভিযোগ তোলে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনার জন্য প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ করেন এবং মেসি ও দর্শকদের কাছে ক্ষমা চান। তিনি জানান, আয়োজনের গাফিলতিতে তিনি বিস্মিত। দায়িত্ব নির্ধারণে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আশিম কুমার রায়ের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন তিনি।
তৃণমূল কংগ্রেসও আয়োজকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেয়। দলের এক শীর্ষ নেতা প্রশ্ন তোলেন, এত বড় অনুষ্ঠানে কীভাবে দর্শকদের জন্য ন্যূনতম পরিকল্পনাও করা হয়নি। তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলেন, “এটা কি কলকাতার সম্মান বাড়াল? শুধুই ব্যবসা আর টাকা? কলকাতা লজ্জিত।”
রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একে “খেলাপ্রেমী কলকাতার জন্য কালো দিন” বলে মন্তব্য করেন। তিনি একাধিক নির্দেশ দেন, যার মধ্যে রয়েছে বিচারবিভাগীয় তদন্ত, আয়োজকের গ্রেপ্তার এবং টিকিটের টাকা ফেরত। এরপরই প্রধান আয়োজক শতদ্রু দত্তের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মেসি সফর ঘিরে হইচই, তদন্তের নির্দেশ: প্রশ্নের মুখে আয়োজক ও প্রশাসন
তবে এই ঘটনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব হলেও, লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করা কোনো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থার কি কোনো দায় নেই ? দর্শকদের নিরাপত্তা, দৃশ্যমানতা এবং প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব কি শুধু প্রশাসনের?
সল্টলেক স্টেডিয়ামের ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে—চকচকে প্রচার আর বাস্তব পরিকল্পনার মধ্যে ফারাক কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমীর স্বপ্ন ভেঙে গেছে এক মুহূর্তে। আর ফুটবলের শহর কলকাতির বুকে রয়ে গেল এক অস্বস্তিকর প্রশ্নচিহ্ন—পরবর্তী বড় আয়োজনের আগে কি কেউ এই শিক্ষা নেবে?
